তরু ও তোশা
তোফাজ্জ্বল হোসেন
পুকুর পাড়ের নিম গাছটায় বাসা বেঁধেছে দুইটা বুলবুলি। অনেক আশা তাদের, বাচ্চা হলে মুক্ত আকাশে ডানা মেলে খেলা করবে। আশায় আশায় দিন কাটতে লাগলো। কিছু দিন পরেই মা বুলবুলি চারটি ডিম দিলো। মা বুলবুলিটা বেশ যত্ন করে ডিম গুলোকে তা দিতে লাগলো। আর বাবা বুলবুলিটা অন্য ডালে বসে পাহারা দিতে লাগলো যেন দুষ্টু ছেলেমেয়ে ডিম না ভাঙে। এভাবে আরও কয়েকটা দিন কেটে গেলো। তারপর, অনেক সাধনার পরে চারটা ছানা হলো। তিনটা ছেলে ছানা আর একটা মেয়ে ছানা। ঐ ছেলে ছানা গুলোর মধ্যে দ্বিতীয়টা একটু ভিন্ন স্বভাবের। সবার থেকে আলাদা। খুবই চঞ্চল প্রকৃতির। যেমন মমতাময়ী তেমনি উদার। সে আনন্দে দিন কাটাতে পছন্দ করে। বিশেষ করে ফুল পাখির সাথে খেলা করতে বেশ পছন্দ করে। বাহারি গাছ হলে তো আর জবাবই নেই। দলবল নিয়ে নাচানাচি শুরু করে দেয়। ছোট ছোট লাল রঙের ফল তার খুবই পছন্দ। তবে সে যত মিষ্টি ফলই হোক না কেন, কাউকে অনাহারী রেখে একটা ফলও মুখে দিবে না। সে সবার মুখে হাসি দেখতে চায় সবসময়। অন্যকে খুশি করার জন্য নিজেকে উৎসর্গ করতেও কুন্ঠিত হবে না। সে সবাইকে নিয়ে রঙিন ভুবনে বাস করতে চায়। এই ছানাটাকে ওর বন্ধুরা "তোশা" নামে ডাকতো। তো একদিন তোশা সবচেয়ে বাহারি ও মিষ্টি ফল খুঁজতে বের হলো। সে তার বন্ধুদের সাথে বলাবলি করতেছে, " আজ আমি বাহারি-মিষ্টি ফল না নিয়ে বাসায় ফিরবো না।" বন্ধুরা বললো,"এই রকম কথা তো প্রায়ই শুনি।" তোশা বললো আজ সিরিয়াসলি বলতেছি, এই রকম ফল না নিয়ে বাসায়ই ফিরবো না, প্রমিজ,প্রমিজ,প্রমিজ। সারাটা দিন চলে গেলো। কোথাও আশানুরূপ ফল খুঁজে পেল না। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। বন্ধুরা এখন ওকে নিয়ে হাসাহাসি করতে লাগলো। তোশা'র গায়ে লাগলো ওদের কথা। তাই সে রাগেই বললো, "তোরা চলে যা সবাই, আমি একা একাই খুঁজতে যাব।" সবাই নিজ নিজ বাসায় চলে গেলো। একা এখন তোশা। সে ভাবতে লাগলো এই জংগলেই আজকের রাতটা কাটাতে হবে। পরদিন সকালে আবার খুঁজতে রওনা দিলো। আজকের দিনটাও বিফলে গেলো। এর পরের দিন গোধূলি বেলায় তোশা'র চোখে ভেসে উঠলো একটা বাহারি তরু। রোদের লাল আভায় ঝলমল করতে ছিলো। সে মনে মনে ভাবতে লাগলো এই বাহারি তরুতেই বোধ হয় বাহারি ফল পাবো। এই ভেবে সে নিচে নামলো এবং মগ ডালটাতে বসলো। এদিক ওদিক তাকাতে লাগলো কোন ফল পাওয়া যায় কি না। প্রথমেই তার চোখে ভেসে ওঠলো চমৎকার এক গুচ্ছ ফুল। সে এখন আরও ভালো করে খুঁজতে লাগলো। অবশেষে তার কাঙ্কিত ফলটাও খুঁজে পেলো। সে একটু ছেঁকে দেখলো। যেমনটি চাইছিলো ঠিক তেমনই পেয়ে গেলো। কোন দিন এমন স্বাদের ফল সে খায় নি। মনের সুখে সে নাচতে লাগলো......তাক ধি না ধিন ধিন ধিন তা। এই দিকে সূর্যটাও জঙ্গলের মাথা থেকে আস্তে আস্তে নিচে নেমে গেলো। সন্ধ্যা ঘনিয়েছে। তোশা ভাবতে লাগলো, আমি একা একা এই ফল খাবো আর অন্যরা খেতে পারবে না তা হয় না। আজ যদি বন্ধুরা আমার কাছে থাকতো! নিজেরাও খেতে পারতাম অন্যরাও খেতে পারতো। এলাকায় কত কত অভাবী ছানা আছে,তাদের মুখে যদি একটা ফলও দিতে পারতাম নিজেকে ধন্য মনে হতো। কিন্তু কিভাবে আমি এত দূর থেকে ফল নিয়ে যাব। আমি তো দুইটার বেশি ফল ঠোঁটে করে নিতে পারব না। ভাবতে ভাবতে আনমনা হয়ে গেলো। হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়লো সে। হাতের কাছে বাহারি ফল থাকতেও না খেয়ে ঘুমালো, কারন, অনাহারীদেরকে রেখে সে একা ভোগ করতে পারবে না। ঠিক যেন লালন ফকিরের অবস্থা। মেঘনা থাকা সত্ত্বেও জল পিপাসায় মরতে হলো। আস্তে আস্তে ভোর হয়ে গেলো। সূয্যি মামা পূবাকাশে রক্তিম হয়ে দুলছে। গাছে গাছে পাখিরা চেচামেচি শুরু করেছে। হঠাৎ তোশা'র ঘুম ভাঙলো। আবার সেই একই চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। এবার একটা বুদ্ধি মাথায় আসলো। বুদ্ধিটা এই রকম, যেহেতু সে দুইটার বেশি ফল ঠোঁটে নিতে পারবেই না,সে দুইটা ফল মা বাবার জন্য নিয়ে যাবে। সেই ফল দুটুর বীজ পুকুর পারে রোপণ করবে। প্রতিদিন যত্ন করলে এই রকম তরুতে পরিণত হবে। পরে এই তরুর ফল সবাই ভোগ করতে পারবে। তখন কেউ আর অনাহারী থাকবে না। অতঃপর, তার মুখে হাসির রেখা দেখা গেলো। পাশের ডোবা থেকে গোসলটা সেরে এবার কয়েকটা ফল খাইলো। দুপুর বেলায় বাসার দিকে রওনা দিলো। সাথে দুইটা ফল মা বাবার জন্য নিলো। পরের দিন সন্ধ্যায় বাসায় পৌছলো। মা বাবা ভেবেছিলো ছেলেটা হারিয়ে গেলো বুঝি। হঠাৎ ছেলেকে পেয়ে মা বাবা আনন্দে আত্মহারা। ফল দুটো মা বাবাকে নিজে খাইয়ে দিলো। পরে বীজ দুটো বাসায় গুজে রাখলো। মা ছেলের কাণ্ড দেখে হাসতে লাগলো আর বললো এগুলো রেখে দিচ্ছিস কেন? উত্তরে সে বললো, " মা, আমরা রাজকীয় খাবার খাবো আর আমার চার দিকে শত শত অনাহারী উপবাস থাকবে তা হয় না মা।" ছেলের এই উদারতা দেখে মা বাবা দুজনই খুশি হলেন। বাবা বললো,"ঠিকই বলেছিস, এই বীজ দুটো রোপণ করলে শুধু অনাহারীর মুখে খাবারই না বাসস্থানও মিলবে। আর সেই সাথে ছোট ছোট ছানারা বাহারি রঙের তরু পেয়ে মহানন্দে দিন কাটাতে পারবে।" পরের দিন তোশা'র মা বাবা তাকে বীজ রোপণে সাহায্য করলো, তোশাও খুব আনন্দিত। কিছু দিন পর চারা গজালো। তোশা প্রতিদিন তার সরু ঠোঁটে করে পুকুর থেকে একটু একটু জল দিতে লাগলো। কখনো গোসল শেষে চারার গোড়ায় ভেজা ডানা ঝারা দিতে লাগলো। দেখতে দেখতে তরুটাও বেশ বড় হয়ে গেলো। এখন আর তার এলাকায় কেউ অনাহারী থাকবে না,বাসস্থান ছাড়া কেউ থাকবে না। ছোট ছানাদেরকে মিষ্টি ফল খুঁজতে দূর-দূরান্তে পাড়ি জমাতে হবে না। অবশেষে তোশা'র বন্ধুরাও তাকে নিয়ে গর্ব করতে লাগলো। সবাই একটা রঙিন ভুবন খুঁজে পেল।
